![]() যে কারণে ও যেভাবে খুন হলেন সাংবাদিক নাদিম: আটক ৪
নতুন বার্তা, বকশীগঞ্জ:
|
![]() মূলতঃ দীর্ঘদিন থেকেই সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী নাদিম ইউপি চেয়ারম্যান মাহমুদুল আলম বাবুকে নিয়ে সংবাদ করার জের ধরে উত্তেজনা চলছিল। সাংবাদিক নাদিমের ফেইসবুক প্রফাইল রাব্বানী নাদিম জুড়ে সেই উত্তেজনার নানা অংশ দেখা যায়। গত বুধবার চেয়ারম্যানের করা ডিজিটাল সিকিউরিটি এ্যাক্টে মামলা খারিজ হওয়া সংক্রান্ত দু'টি ষ্ট্যাটাস রয়েছে। যার একটিতে সংবাদ লিংক এবং অন্যটিতে মামলা খারিজ হওয়া সংক্রান্ত ষ্ট্যাটাস রয়েছে। বুধবার তার পূর্বের ষ্ট্যাটাসটিতে দেখা যায় চেয়ারম্যান একজন স্কুল ছাত্রীকে জড়িয়ে ধরে আছে। সেটা নিয়ে বানানো একটি ভিডিও শেয়ার করে লিখেছেন "ফুলের গলায় দিয়ে আম কুড়াতে যাই...."। বুধবারই অন্য এক ষ্ট্যাটাসে লিখেন, "অসহায় ও বিপদ গ্রস্থ নারী বিচারের জন্য গেলেই সর্বনাশ।। @# স্ত্রীর অভিযোগ।। সাধু! সাধু!! সাধু!!!" জুনের ১৩ তারিখ এক ষ্ট্যাটাসে লিখেন" শত্রুতা যখন ব্যক্তি পর্যায়ে পৌছে তখন তা ব্যক্তিগত হয়ে যায়।। শত্রুর সাথে কোন নিয়ম-নীতি নাই, ধ্বংসটাই মুখ্য!!" জুনের ১২ তারিখ অপর এক ফেইসবুক ষ্ট্যাটাসে লিখেন, "মুদি দোকানদার হতে শতকোটি টাকার মালিক।। মাঝখানে নেতা-কাম-জনপ্রতিনিধি। সাধু! সাধু!!" মোটকথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উত্তেজনার পুরোটা দেখা যায়। গোলমাল বাধে যখন সাংবাদিক নাদিমের বিরুদ্ধে করা মামলাটি আদালত খারিজ করে দেয়। তারপরই ফেইসবুকে ষ্ট্যাটাস দেয় সাংবাদিক নাদিম। এরপর বুধবার অফিসের কাজ শেষে রাত ১০টার দিকে মোটরসাইকেলে করে বাড়ি ফিরছিলেন সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী নাদিম ও তার সহকর্মী আল মুজাহিদ বাবু। পথে বকশীগঞ্জ পাথাটিয়ায় পৌঁছালে সামনে থেকে অতর্কিত আঘাত করে চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে তাকে ফেলে দেওয়া হয়। এরপর দেশীয় অস্ত্রধারী ১০-১২ জন দুর্বৃত্ত তাকে সড়ক থেকে মারধর করতে করতে টেনেহিঁচড়ে অন্ধকার গলিতে নিয়ে যায় এবং তার মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি আঘাত করে। সেসময় সহকর্মী মুজাহিদ তাদের আটকাতে গেলে তাকেও মারধর করে দুর্বৃত্তরা। পরে মুমূর্ষু অবস্থায় সহকর্মী মুজাহিদ ও স্থানীয়রা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু আঘাত গুরুতর হওয়ায় সেখানকার চিকিৎসক তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। বুধবার রাত ১০টার দিকে বকশীগঞ্জের পাথাটিয়ায় ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের বুথের সামনে ঘটে যাওয়া ওই নৃশংস হামলার বর্ণনা দেন সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী নাদিমের সহকর্মী আল মুজাহিদ বাবু। তিনি বলেন, সাধুরপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাহমুদুল আলম বাবুর অপকর্ম নিয়ে নাদিমসহ আমরা কয়েকজন নিউজ করেছিলাম, তারপর থেকেই তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে আছেন আমাদের ওপর। পরে আমাদের নামে ডিজিটাল আইনে মামলাও করেন তিনি। সেই মামলা গতকাল ময়মনসিংহের সাইবার ট্রাইব্যুনাল খারিজ করে দিয়েছেন। এ নিয়ে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেওয়া হয়েছিল। এর দুই তিন ঘণ্টা পর রাতে অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে নাদিমের ওপর হামলা হয়। তিনি আরও বলেন, নাদিমকে চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। তারপর তাকে মারতে মারতে পাশের একটি অন্ধকার গলিতে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করেন চেয়ারম্যান মাহমুদ আলম বাবুর লোকজন। ঘটনার সময় ওই গলিতে অন্ধকারে আড়ালে দাঁড়িয়েছিলেন চেয়ারম্যান মাহমুদ আলম বাবু। সেসময় তার ছেলে ফয়সাল, রিফাত, রেজাউল, মনির, সাইদসহ আরও কয়েকজন ছিলেন। মারধরের সময় আমি আটকাতে গেলে আমাকেও তারা মারধর করেন। পরে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে চেয়ারম্যানের সন্ত্রাসী বাহিনী চলে যায়। পরে নাদিমকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। গেল ১০ মে ইউপি চেয়ারম্যান মাহমুদুল আলম বাবুকে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন তার দ্বিতীয় স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন। এ নিয়ে দুইবার বিয়ের পরও সন্তান-স্ত্রীকে অস্বীকার করছেন ইউপি চেয়ারম্যান!’ শিরোনামে সংবাদ করে। পরে ১৪ মে তার স্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে ‘আমি আমার স্বামী চাই, একসঙ্গে সংসার করতে চাই’ শিরোনামে আরও একটি সংবাদ প্রকাশ করে। পরে ২০ মে সাবিনা ইয়াসমিন তার স্বামী মাহমুদুল আলম বাবুকে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার অথবা পদ থেকে তার অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করেন। বাবু জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার সাধুরপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। এ নিয়েও ‘আ.লীগ থেকে স্বামীর বহিষ্কার চেয়ে স্ত্রীর আবেদন’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে। এর আগে গত ১৪ মে ময়মনসিংহ সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালে জামালপুরের নাদিমসহ দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করেন সাধুরপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাহমুদুল আলম বাবু। ১৪ জুন আদালত মামলাটি খারিজ করেন। নিহত গোলাম রব্বানির স্ত্রী মনিরা বেগম সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করে বলেন, সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে বকশীগঞ্জের সাধুরপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মাহমুদুল আলম তার (গোলাম রাব্বানী) ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। আগেও তিনি নানাভাবে হেনস্তা করার চেষ্টা করেছেন। ওই ইউপি চেয়ারম্যানের লোকজনই হামলা করে তাকে হত্যা করেছেন। তিনি এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। জানতে চাইলে জামালপুরের পুলিশ সুপার নাছির উদ্দিন আহমেদ বলেন, নিহত সাংবাদিকের ওপর হামলাকারীদের সিসিটিভি ফুটেজের মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে পুলিশের পাঁচটি দল মাঠে কাজ করছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করা হবে। ওই সাংবাদিকের স্বজনেরা ব্যস্ত থাকায় এখনো থানায় মামলা হয়নি। সেসময় স্থানীয়রা জানায়, পেশাগত দায়িত্ব পালন শেষে বাড়ি ফিরছিলেন সাংবাদিক নাদিম। পথে মধ্যবাজার এলাকায় পৌঁছালে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহিনার সমর্থক যুবলীগ নেতা শামীম খন্দকার, স্বপন মণ্ডল, শেখ ফরিদের নেতৃত্বে কয়েকজন তার ওপর হামলা করে। হামলাকারীরা তাকে মারধর করে। এতে আহত হলে তাকে উদ্ধার করে বকশীগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী নাদিম ওই হামলা নিয়ে বলেন, রাজাকার ইস্যুসহ আওয়ামী লীগের কমিটি নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করায় আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহিনা বেগমের নির্দেশে তার সমর্থক স্বপন, শেখ ফরিদ, শামীম আমার ওপর হামলা করে। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ছিলেন চেয়ারম্যান বাবু এক চেয়ারম্যানের অপকর্ম নিয়ে একের পর এক সংবাদ প্রকাশ করেছিলেন সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী নাদিম। সেই সংবাদের জেরে ময়মনসিংহ সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালে মামলাও হয়েছিল। পরে তা খারিজ হয়ে যায়। এরপরই দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী নাদিম। হামলার পর তাকে নেওয়া হয় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার (১৫ জুন) তার মৃত্যু হয়। গোলাম রাব্বানী নাদিম উপজেলার নিলাখিয়া ইউনিয়নের গোমের চর গ্রামের আবদুল করিমের ছেলে। স্থানীয় সেই চেয়ারম্যান বকশীগঞ্জ উপজেলার সাধুরপাড়া ইউনিয়নের। তার নাম মাহমুদুল আলম বাবু। এই বাবু উপজেলার সাধুরপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। পুলিশ গ্রেফতার করছে না চেয়ারম্যান বাবুকে বকশীগঞ্জ উপজেলার সাধুরপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও সাধুরপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল আলম বাবুকে এখনও গ্রেফতার করছে না পুলিশ। যদিও এই হত্যাকান্ডে চেয়ারম্যান বাবু'র সংশ্লিষ্টতা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। এই বিষয়ে বকশিগঞ্জ থানার ওসি মোহাম্মদ সোহেল রানাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, মূলত সিসিটিভি ক্যামেরা বিশ্লেষণ করে আমরা যাদের চিহ্নিত করছি, তাদের আটক করছি। আসলে এখনো কোনো অভিযোগও তো আমরা পাইনি। ঘটনাস্থলে যারা যারা ছিল তাদের যদি অভিযোগ পাই তাহলে শতভাগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাংবাদিক নাদিম হত্যায় জড়িত চারজন আটক সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী নাদিমকে হত্যার ঘটনায় জড়িত চারজনকে আটক করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার (১৫ জুন) বিকেলে প্রথম জানা যায়, নাদিম হত্যার ঘটনায় পুলিশ তিনজনকে আটক করেছে। এ তথ্য জানান বকশিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোহেল রানা। পরবর্তীতে রাত ৮টার দিকে জামালপুর পুলিশের সারর্কেল এএসপি সুমন কান্তি দাস জানান, এ ঘটনায় পুলিশ চারজনকে আটক করেছে। সুমন কান্তি বলেন, নাদিম হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজনকে আটক করা হয়েছে। তারা হলেন- গোলাম কিবরিয়া সুমন, মো. তোফাজ্জল, আয়নাল হক ও মো. কফিল উদ্দিন। আটকদের নাম জানাতে পারলেও তাদের বিস্তারিত তথ্য দিতে পারেনি পুলিশ। এর আগে বিকেলে সাংবাদিক নাদিম হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত চেয়ারম্যানকে আটকের ব্যাপারে বকশিগঞ্জ থানার ওসি মোহাম্মদ সোহেল রানাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, মূলত সিসিটিভি ক্যামেরা বিশ্লেষণ করে আমরা যাদের চিহ্নিত করছি, তাদের আটক করছি। আসলে এখনো কোনো অভিযোগও তো আমরা পাইনি। ঘটনাস্থলে যারা যারা ছিল তাদের যদি অভিযোগ পাই তাহলে শতভাগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাংবাদিক নাদিম হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন-বিক্ষোভ সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী নাদিম হত্যার প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছে কর্মরত গণমাধ্যমকর্মীরা। বরিশাল গোলাম রাব্বানী নাদিমের হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবিতে প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন করেছে বরিশালের সাংবাদিকরা। নগরীর অশ্বিনী কুমার টাউন হলের সামনে ঘণ্টাব্যাপী এ মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন সিনিয়র সাংবাদিক আনিছুর রহমান স্বপন। এসময় জেলার কর্মরত সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। ফেনী সন্ত্রাসী হামলায় সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী নাদিম হত্যার প্রতিবাদে ফেনীতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে ফেনী প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি মুহাম্মদ আবু তাহের ভূঞার সভাপতিত্বে ও ইয়ুথ জার্নালিস্ট ফোরাম ফেনীর সভাপতি শাহজালাল ভূঞার সঞ্চালনায় কর্মসূচি পালিত হয়। কর্মসূচিতে জেলায় কর্মরত প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। লক্ষ্মীপুর সন্ধ্যায় সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী নাদিমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় লক্ষ্মীপুরে প্রতিবাদসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রেস ক্লাব সাধারণ সম্পাদক সাইদুল ইসলাম পাবেলের সভাপতিত্বে ও সাংবাদিক মীর ফরহাদ হোসেন সুমনের সঞ্চালনায় সভায় সাংবাদিক কামাল হোসেন, একিউএম শাহাবুদ্দিন, কামাল উদ্দিন, সাইফুল ইসলাম স্বপন, মাজহারুল আনোয়ার টিপু, কাজল কায়েস, সানা উল্লাহ সানু, নাজিম উদ্দিন রানা ও নিজাম উদ্দিন প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। |