![]() তরমুজ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন দক্ষিণাঞ্চলের চাষিরা
নতুন বার্তা, বরিশাল:
|
![]() বরিশাল সদর উপজেলার লাহারহাট সংলগ্ন চরলড়াইপুরের বাসিন্দা মোনছের হাওলাদার এবার বাঙ্গি চাষ করেছেন। তুলনামূলক ক্রেতা চাহিদা কম হলেও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মৌসুমের রসালো এই ফল চাষ করে সংসার চালাবেন। অথচ বছর দুই আগেও পুরোদস্তুর তরমুজ চাষি ছিলেন তিনি। মোনছের হাওলাদার বলেন, নদীর পলিমাটিতে পত্তন হওয়া চরে তরমুজের ফলন খুব ভালো হতো। ক্ষেতে ১৫-২০ কেজি ওজনের তরমুজও হতো। তারপরও লাভ ঘরে তুলতে পারতাম না। ঋণের টাকা পরিশোধ করতে পারছিলাম না। শেষে বাপ-দাদার ব্যবসা তরমুজ চাষই ছেড়ে দিয়েছি। তিনি বলেন, পুরোপুরি আড়তদারদের কব্জায় বাজার নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় চাষিরা মূলধন হারিয়ে ফেলছেন। আমি এখনো ৬৭ হাজার টাকা ঋণী। অথচ দুই বছর হলো তরমুজ চাষ ছেড়েছি। শুধু মোনছের হাওলাদারই নয়, একই গ্রামের আবু, রশিদ, সাদ্দামও ছেড়ে দিয়েছেন তরমুজ চাষ। আব্দুর রশিদ বলেন, ক্ষেতে ফলন ফলাই আমরা, অথচ কত দামে বিক্রি হবে তা নির্ধারণ করেন আড়ৎদারেরা। তাদের কিন্তু কোনো লোকসান নেই। ক্ষেত থেকে পরিবহন খরচ দিয়ে আড়তে পৌঁছে দেই। তারপরও দাম পাই না। দুই মৌসুম আগে আমিও ছেড়েছি তরমুজ চাষ। শেষ বার ক্ষেত থেকে ১১০০ পিস তরমুজ নিয়ে গেলাম বরিশালের আড়তে। সেই তরমুজের দাম দেয় ৭ হাজার। সাড়ে ৬ টাকা প্রতি পিস। এরপরই সিদ্ধান্ত নিই আর তরমুজ চাষ করব না। তিনি বলেন, দুই লাখেরও বেশি ঋণ ছিলাম। প্রায়ই দিয়ে ফেলেছি। এখন ৪৬ হাজার টাকা পাবে। এসব টাকা আথালের গরু বিক্রি করে পরিশোধ করেছি। এখন অন্যের ক্ষেতে মজুরি করি। এছাড়া উপায় নেই। মাঠের কৃষকদের কথা কোনো সরকারও শোনে না, কোনো নেতাও শোনে না। তরমুজের জমিতে খিরাই চাষ করেছেন সাদ্দাম হোসেন। তিনি বলেন, আনুমানিক ৪-৫ কেজি থেকে ১৫-১৬ কেজি ওজনের তরমুজের একই দাম। ৪-৫ কেজির কম ওজনের তরমুজ বিনা মূল্যেই আড়তে দিয়ে আসতে হয়। আমরা পিস হিসেবে বিক্রি করলেও বাজারে শুনেছি কেজি দরে বিক্রি হয়। শুধু চর লড়াইপুরেই নয়, এমন চিত্র বিভাগের অন্যান্য জেলায়ও। মৌসুমের জনপ্রিয় ফল তরমুজের বাজার ভালো থাকলেও দাম না পেয়ে চাষে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন চাষিরা। অনেকেই অন্যান্য ফসলে স্থানান্তরিত হচ্ছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যেও মিলেছে এর প্রমাণ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২১-২০২২ অর্থবছরে বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় ৪৬ হাজার ৪৫১ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে রেকর্ড ৬৪ হাজার ১৮৩ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ করা হয়েছিল। সে বছর বিভিন্ন জেলার শত শত চাষি তাদের তরমুজ বরিশাল পোর্ট রোড মোকামে এনে দাম না পেয়ে নদীতে ফেলে দিয়েছিলেন। যার কারণে ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে আবাদ হয়েছে ৪৬ হাজার ৮৪৫ হেক্টর জমিতে। চলতি মৌসুমে (২০২৪-২০২৫) পূর্ণাঙ্গ তথ্য না পাওয়ায় সম্পূরক তথ্য সরবারহ করতে পারেনি দপ্তরটি। তবে জেলা পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, বিগত মৌসুমের কাছাকাছি বা তার কম আবাদ হতে পারে। কৃষকরা তরমুজ চাষে বিভিন্ন কারণে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন এমন তথ্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কাছেও রয়েছে। পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চর নজিরের কৃষক পলাশ হাওলাদার জানান, তরমুজ চাষিরা পদে পদে হেনস্থা হন। পরিবহনে ঘাটে ঘাটে চাঁদা, আড়তদারদের সিন্ডিকেট, ভালো বীজের সংকট চরম। গত বছর আমি পাঁচ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করেছি। এ বছর মাত্র তিন বিঘায় করেছি। পর্যায়ক্রমে হয়তো চাষ গুটিয়ে নেব। তিনি বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে রাঙ্গাবালীতে বেশি আবাদ হয় তরমুজের। এ বছর এই উপজেলায় সারের জন্য হাহাকার চলছে। সারের ডিলাররা বেশি দামে বিক্রি করার জন্য মজুত করে রেখেছে। সরকারি অফিসে জানিয়েছি। কোনো লাভ হয়নি। পলাশ হাওলাদার বলেন, কৃষি অফিস কোনো দিন ক্ষেতে এসে তথ্য নেয় না। আপনারা (সাংবাদিক) তাদের কাছে জানতে চান, তারা বলে দেয় বাম্পার ফলন। একেবারে মিথ্যা। চাষ ভালো হয়, কিন্তু অনেক কৃষক তরমুজ চাষ ছেড়ে দিচ্ছে লোকসানে। ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার দক্ষিণ আইচার বাসিন্দা আকতার হোসেন বলেন, ভোলার কৃষকরা যুগ যুগ ধরে টিকে আছেন তরমুজ চাষ করে। তরমুজ চাষ লাভবান হওয়ায় আমাদের ওপর এই এলাকার অর্থনীতি জড়িত। কিন্তু সরকার কখনো আমাদের পাশে দাঁড়ায়নি। উল্টো তরমুজ বাজারে নিতে ঘাটে ঘাটে চাঁদা দিতে হয়। নদীর মাঝে ট্রলার থামিয়ে চাঁদা নেয়। আড়তদারদের কাছে গেছে তারা এমন দাম বলে যাতে মুনাফাও ওঠে না। তরমুজ যেহেতু দ্রুত পচে যায় সেজন্য বাধ্য হয়ে আমরা দিয়ে আসি। তিনি বলেন, আমার পরিচিত চাষির মধ্যে এই মৌসুমে ছয়জন আছেন যারা ভালো দাম না পেয়ে চাষাবাদ ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয় থেকে জানা গেছে, ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে বরিশাল বিভাগে ৯৫৩ কোটি টাকার তরমুজ বিক্রি হয়েছে। সে বছর তরমুজের কেজি ধরা হয় ৩৫-৪০ টাকায়। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ১১০০ কোটি টাকার তরমুজ বিক্রি হয়। চলতি মৌসুমে তরমুজ বাজারে না আসায় আগেই ধারণা করা যাচ্ছে না কেমন হবে এবারের বাজার। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর বরিশাল বিভাগের উপ-পরিচালক এসএম মাহবুব আলম বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের মাটির উর্বরতা ও আবহাওয়া অনুকূল হওয়ায় তরমুজ সম্ভাবনাময় ফসল। গত মৌসুমে এক হাজার কোটির বেশি টাকায় বিক্রি হয়েছে তরমুজ। বিশেষ করে ভোলা ও পটুয়াখালী জেলায় প্রচুর তরমুজ হয়। তবে বিভিন্ন কারণে সঠিক বাজারমূল্য পান না কৃষক। কৃষকরা না বাঁচলে তরমুজের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে তা টিকিয়ে রাখাটা মুশকিল হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বরিশাল অঞ্চলের উদ্যোন বিশেষজ্ঞ জিএমএম কবীর খান বলেন, দক্ষিণাঞ্চলে তরমুজ চাষ লাভজনক। বাজার চাহিদা ও মূল্য ভালো থাকায় কৃষকরা সহজে লাভবান হতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ভালো ফলন করেও কৃষক তার উৎপাদিত ফসল সরাসরি বাজারে বিক্রি করতে পারছেন না। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে কৃষকের চেয়ে বেশি লাভ নিয়ে নিচ্ছে তারা। এর কারণে অনেকে নিরুৎসাহিত হতে পারে। আমি মনে করি অর্থনীতির সম্ভাবনাময় এই উৎপাদন সঠিকভাবে বাজারব্যবস্থা করা ও কৃষকের লাভ নিশ্চিত করা উচিত। |