![]() প্রধান উপদেষ্টার চীন সফর ও বাংলাদেশের প্রত্যাশা
রায়হান আহমেদ তপাদার:
|
![]() ড.ইউনূস চলমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করবেন এবং সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র খুঁজে বের করার চেষ্টা চালাবেন। বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও নবায়ন যোগ্য জ্বালানি,প্রযুক্তি ও ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মতো অন্যান্য খাতে চীনা বিনিয়োগ উৎসাহিত করা হতে পারে। নবায়নযোগ্য শক্তি, প্রযুক্তি এবং উৎপাদন ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধার বিষয়গুলো তুলে ধরা যেতে পারে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বৃত্তি ও অ্যাকাডেমিক সহযোগিতার মাধ্যমে মানুষে মানুষে সম্পর্ক জোরদারকরণ সদিচ্ছা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়িয়ে তুলতে পারে। বৃত্তি ও অ্যাকাডেমিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে শিক্ষাগত সহযোগিতা জোরদার করা যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স ও ডিজিটাল অবকাঠামোর মতো উদীয়মান ক্ষেত্রগুলোতে প্রযুক্তিগত সহায়তা নেয়ার বিষয়টি এ সফরে গুরুত্ব পেতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাবের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য শান্তি ও স্থিতিশীলতার গুরুত্বের ওপর জোর দিতে পারে। আন্তঃদেশীয় রেলপথ, মহাসড়ক ও বন্দরের মতো আঞ্চলিক সংযোগ উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর পক্ষে অ্যাডভোকেসি করা যেতে পারে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে সংযোগকারী একটি প্রধান আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশকে বিবেচনা করা যেতে পারে। চীনের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই) ও গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভে (জিএসআই) বাংলাদেশের অংশগ্রহণ অন্বেষণ করা যেতে পারে, যা নিশ্চিত করে যে, এগুলো বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেহেতু উভয় দেশ জলবায়ু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, টেকসই উন্নয়ন ও সবুজ প্রযুক্তি বিষয়ে সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হতে পারে। এ সফরটি দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০তম বার্ষিকীর সাথে মিলে যায়, যা অতীতের অর্জনগুলো প্রতিফলিত করার এবং ভবিষ্যতের সহযোগিতার জন্য একটি দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণের জন্য একটি আদর্শ মুহূর্ত। টেকসই উন্নয়নের জন্য জ্ঞান বিনিময় ও প্রযুক্তি হস্তান্তরসহ জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সহযোগিতামূলক প্রচেষ্টার প্রস্তাব করা যেতে পারে। সবুজ শক্তি ও দুর্যোগ স্থিতিস্থাপকতা সম্পর্কে যৌথ গবেষণার উদ্যোগ অন্বেষণ করা যেতে পারে। উচ্চ প্রযুক্তির প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহসহ সামরিক সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো অন্বেষণ করা জরুরি। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে উত্তেজনা বাড়াতে পারে এমন পদক্ষেপ এড়িয়ে যেতে হবে। ১৯৭৫ সাল থেকে বাংলাদেশ চীনের প্রধান অস্ত্র ক্রেতা। ২০১৯-২৩ সালের মধ্যে চীনের মোট অস্ত্র বিক্রির ১১ শতাংশই ছিল বাংলাদেশে। ২০১৯-২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট অস্ত্র আমদানির ৭২ শতাংশ চীন থেকে এসেছে। বর্তমান প্রয়োজনের প্রেক্ষাপটে আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম যুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা ও সামরিক সামর্থ্য উন্নত করতে চীন থেকে ড্রোন প্রযুক্তি অর্জনের প্রচেষ্টা চালাতে হবে। তাছাড়াও রোহিঙ্গা শরণার্থী সঙ্কট সমাধানে চীনের সম্ভাব্য ভূমিকা এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানে মিয়ানমার ও আরকান আর্মির ওপর চীনের প্রভাব কাজে লাগানোর সম্ভাব্যতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এ বিষয়গুলো কেবল তাৎক্ষণিক প্রয়োজনের সমাধান করে না;বরং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সহযোগিতার ভিত্তিও স্থাপন করে।ভারত বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো অন্যান্য কৌশলগত অংশীদারদের বিচ্ছিন্ন করতে পারে এমন জোট এড়িয়ে ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক সম্পর্কের প্রতি বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতির বিষয়টি মনে রাখা জরুরি। ড. ইউনূস শুরু থেকে বাংলাদেশে ম্যানুফেকচারিং হাব তৈরির ব্যাপারে বিভিন্ন পক্ষকে আমন্ত্রণ জানিয়ে আসছেন। এ দেশে সোলার এনার্জি তৈরির জন্য চীনকে অনুরোধ জানিয়েছেন। সেই সাথে দেশে উন্নত প্রযুক্তির যানবাহন, সামরিক অস্ত্র তৈরির ব্যাপারে তুরস্ক, পাকিস্তান ও চীন থেকেও সাড়া পাওয়া গেছে। এ সফরে চীনের সাথে সেটি আরো পোক্ত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্বের বৃহত্তম সৌর প্যানেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান চীনের ‘লংগি’ বাংলাদেশে অফিস স্থাপন এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। চীনে লংগি ছাড়াও বেশ কয়েকটি সৌরবিদ্যুৎ জায়ান্ট আছে। বিশ্বব্যাপী সৌরশক্তি বাজারে চীনের আধিপত্যের মূল শক্তি এসব প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে আনতে পারলে দেশে প্রতিযোগিতামূলক দামে সোলার প্যানেল পাওয়া যাবে। কোম্পানিগুলো বাংলাদেশ থেকে রফতানি করতে পারবে।বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের মানোন্নয়ন নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার এ সফরে আলোচনা হবে। প্রধান উপদেষ্টা চান, চীনের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে বাংলাদেশের সাথে যৌথভাবে হাসপাতাল তৈরি করে। ২০১৬ সালে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনরুত্থান প্রজেক্টের ঋণের জন্য চীনের দ্বারস্থ হয় বাংলাদেশ। ভারতের কারণে তেমন অগ্রগতি হয়নি। এটি বাংলাদেশ-ভারত-চীনের ত্রিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি অন্যতম বিষয়। এ সফরে ইতিবাচক কিছু হলে সেটি এ অঞ্চলে নিজেদের কৌশলগত স্বাধীনতা প্রমাণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় অর্জন হবে।২০২৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর চীন আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে। তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে ইয়ারলুং জাংবো নদীর ওপর বাঁধটি সমাপ্তির পরে বার্ষিক ৩০০ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। এটি চীন-ভারত সীমান্তের কাছে তিব্বতের গ্রেট বেন্ডের কাছে নির্মিত হবে। নদীটি ব্রহ্মহ্মপুত্র নাম নিয়ে ভারতে থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ভারত অরুনাচল প্রদেশের সিয়াং নদীতে সিয়াং উপরি মাল্টিপারপাস বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে।ফলে চীন-ভারত পানিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে। চীন ও ভারতের বিরোধে যাতে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে। ভারতের চাপ সত্ত্বেও বাংলাদেশ ভারতের ওপর তার অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমাতে চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যেকোনো সম্ভাব্য হুমকি পর্যবেক্ষণে নজরদারি ও গোয়েন্দা তথ্যের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করেছে ভারত। আঞ্চলিক আধিপত্য বজায় রাখতে ভারত তার নিজস্ব সামরিক আধুনিকায়ন কর্মসূচি ত্বরান্বিত করছে নতুন প্রযুক্তির যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করছে। ভারত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সাথে তার অংশীদারিত্ব জোরদার করতে পারে যাতে এ অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান চীনা প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট তৈরি করা যায়। বাংলাদেশে ভারত কৌশলগত পাল্টা প্রভাব বিস্তারে জড়িত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে বৈদেশিক সহায়তা কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে ঢাকা বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়তে বাধ্য। এটি চীনের কাছে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব হারানোর যুক্তরাষ্ট্রের আখ্যানকে আরো জোরদার করতে পারে।ভারতের ক্ষেত্রে, প্রতিক্রিয়া আরো সূক্ষ্ম হতে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ড. ইউনূসের চীন সফর নয়াদিল্লিতে সতর্কতা সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ কৌশলের পরিপ্রেক্ষিতে, যার লক্ষ্য ভারতকে ভূরাজনৈতিকভাবে ঘিরে ফেলা। তবে ড. ইউনূস ভারতের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক বজায় রাখার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন, এ সফরটি তাদের সম্পর্ককে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রথম দ্বিপাক্ষিক সফর হওয়াটাই একে বিশেষভাবে তাপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। প্রধান উপদেষ্টার সফরটি ভূ-রাজনীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস এমন সময়ে বাংলাদেশের দায়িত্ব নিয়েছেন যখন দেশটির অর্থনীতি নানামুখী চাপে রয়েছে। ফলে, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেয়া অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে তার সরকারের জন্য।বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থায় চীনের মত বড় ও স্থিতিশীল অর্থনৈতিক সহযোগীর আনুকূল্য প্রয়োজন, বলছেন বিশ্লেষকরা। লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক |