![]() চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক: চুনতির জাঙ্গালিয়া এলেই চালকদের হচ্ছেটা কী?
নতুন বার্তা, চট্টগ্রাম:
|
![]() স্থানীয়দের কারও কারও ধারণা- এই এলাকায় পৌঁছালেই ‘অশুভ শক্তি’ ভর করে গাড়িচালকদের ওপর। এখানে পৌঁছাতেই চালকরা সড়ক দেখেন কয়েকটি। এরমধ্যে একটি ধরে এগুতেই নিয়ন্ত্রণ হারান গাড়িচালকরা। আর তাতেই ঘটে দুর্ঘটনা। প্রশাসনের কর্তারাও এলাকাবাসী এবং গাড়িচালকদের এমন বিশ্বাসের কথা শুনেছেন। তবে এসব বিষয়ে তারা উড়িয়েই দিচ্ছেন। বলছেন সড়কের অপ্রশস্ততা, বিপজ্জনক বাঁক, উঁচু-নিচু এবং লবণের পানিতে পিচ্ছিল হয়ে যাওয়াসহ নানা কারণে সড়কের এই স্থানে ঘটছে দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনার কারণ যাই হোক, এগুলো শনাক্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। অন্যথায় তারা কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারি দেন। লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ ইনামুল হাছান বলেন, আমরা অনেক ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলেছি। এলাকাবাসীর সঙ্গেও কথা বলেছি। চালকদের কেউ কেউ বলেছেন এখানে তারা কয়েকটি রাস্তা দেখেন। এখানে মাজার ছিল বলে শুনেছি। এখন এটা তো আমাদের বিশ্বাস করার সুযোগ নেই। আবার দুর্ঘটনার এ রকম কারণ আমরা বলতেও পারব না। তবে ধর্মীয় এই বিশ্বাস একেবারে উড়িয়েও দেওয়া যায় না। এদিকে তিনদিনে তিনটি দুর্ঘটনা এবং প্রাণহানির পর টনক নড়েছে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের। সবশেষ বুধবার (২ এপ্রিল) দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক ই আজম (বীর প্রতীক)। তার সঙ্গে ছিলেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমসহ স্থানীয় প্রশাসনের কর্তারা। পাশাপাশি বিএনপি ও জামায়াতের নেতারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু জাঙ্গালিয়া না পুরো চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সমস্যা প্রায় একই। একদিকে সরু সড়ক তার ওপর একের পর এক বিপজ্জনক বাঁক। কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশ্য চলাচলকারী লবণের গাড়ি থেকে পানি পড়ে সড়কের ওপর। তাতেই সড়ক হয়ে যায় পিচ্ছিল। ব্রেকে পা কষতেই নিয়ন্ত্রণ হারায় গাড়ি। আবার পর্যটন শহর কক্সবাজারে যাতায়াত করেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চালকরা। এসব চালকরা জানেন না বিপজ্জনক বাঁক আর সড়কের গঠন সম্পর্কে। একটু এদিক-সেদিক হলেই নিয়ন্ত্রণ হারায় এসব গাড়ি। ফলশ্রুতিতে দুর্ঘটনা ঘটে হরহামেশাই। প্রাণ যায় সাধারণ মানুষের। দুর্ঘটনার কারণ জানতে চাইলে লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ইনামুল হাছান বলেন, প্রথম কারণ বিপজ্জনক বাঁক। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এই সড়ক ব্যবহারকারী চালকরা ভালোভাবে বুঝতে পারেন না সড়কের এই বাঁকগুলো। আবার তারা দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে এই এলাকায় পৌঁছান। এক্ষেত্রে চালকদের অনেকেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। লবণের গাড়ি চলাচলের কারণে সড়কে পানি পড়ে। লবণাক্ত এই পানির কারণে সড়ক পিচ্ছিল হয়ে পড়ে। জাঙ্গালিয়া এলাকায় যে স্থানে দুর্ঘটনা ঘটে সেখানে সড়কটি ঢালু। আমরা আগে বলেছিলাম এই এলাকায় গতিরোধক দেওয়ার জন্য। যাতে অপরিচিত চালকরা গতি নিয়ন্ত্রণ করেন। তখন অবশ্য প্রকৌশলীরা আমাদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। সবশেষ দুর্ঘটনার পর গতিরোধক স্থাপনের কাজ শুরু হয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, সড়কটি সরু। এটি চার লেন করার জন্য কাজ চলছে। একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজ চলছে। বুধবার দুর্ঘটনার স্থান পরিদর্শন করেছেন উপদেষ্টা ফারুক ই আজম। তিনি মুঠোফোনে সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেছেন। আশা করি অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প হিসেবে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কটি দ্রুত চার লেনে উন্নীত হবে। স্থানীয় বাসিন্দা নেওয়াজ হোসেন জানান, চুনতির ফরেস্ট রেঞ্জ অফিসের পাশে জাঙ্গালিয়া এলাকায় মাজার রয়েছে। এখানে প্রায় সময় চালকরা কয়েকটি সড়ক দেখেন। তাই দুর্ঘটনা ঘটছে। না হয় একইস্থানে বার বার দুর্ঘটনার কারণ কি? তবে এমন বিশ্বাস থাকলেও সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে প্রশস্ত না হওয়ায় ক্ষোভ রয়েছে তার। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কটি নামেমাত্র মহাসড়ক। অনেক আঞ্চলিক সড়কও এর চেয়ে প্রশস্ত। জাঙ্গালিয়া ছাড়াও এই সড়কের বিভিন্ন স্থানে প্রায় সময় দুর্ঘটনায় প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়। কিন্তু তাতেও টনক নড়ে না কর্তৃপক্ষের। অথচ দেশের প্রধান পর্যটন স্পটে কক্সবাজারে সড়ক পথে যাতায়াতের এটিই প্রধান মাধ্যম। নানান সময় চার লেনের বিষয়ে আলাপ-আলোচনা হলে বাস্তবে আলোর মুখ দেখে না প্রকল্পটি। আর কত লোকের প্রাণহানি হলে এই সড়কটি প্রশস্ত হবে জানি না। লোহাগাড়ার বাসিন্দা ব্যাংকার মোহাম্মদ আবদুল জলিলের মতে, সড়কটি চার লেনে উন্নীত করার পাশাপাশি লবণবোঝাই গাড়ি চলাচল বন্ধ করতে হবে। লবণের গাড়ির কারণে রাত ১০টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত রাস্তা বিপজ্জনকভাবে পিচ্ছিল হয়ে পড়ে। যার কারণে দুর্ঘটনা বেশি হয়। দোহাজারী হাইওয়ে থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবদুল মতিন বলেন, আমার ৩ মাসের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, কক্সবাজারে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকরা এই সড়ক ব্যবহার করে যাতায়াত করেন। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অপরিচিত চালকরা এই সড়ক দিয়ে গাড়ি চালান। তারা সড়কটি সম্পর্কে জানেন না। পাশাপাশি সড়কে যথাযথ সিগন্যাল নেই। দুর্ঘটনাস্থলের পাশেই একটা বিপজ্জনক বাঁক রয়েছে। অন্য এলাকার চালকরা এটা যে বিপজ্জনক তা বুঝতে পারেন না। ক্ষোভে ফুঁসছেন এলাকাবাসী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি ঘোষণা একের পর এক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানিতে দক্ষিণ চট্টগ্রামবাসীর মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। তারা জানান, সরকার একপ্রকার উদাসীন। এখানে দুর্ঘটনা বন্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। এক দশক আগে থেকে আলোচনা চললেও সড়কটি প্রশস্ত করার বিষয়ে সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। শিগগিরই এ ব্যাপারে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া না হলে কঠোর কর্মসূচি পালনের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। এ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা এহসান চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এত লোকের প্রাণহানির পরও যদি কর্তৃপক্ষের টনক না নড়ে তবে হরতাল ও অবরোধের মতো কর্মসূচি পালন করা হবে। এদিকে, সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে লোহাগড়া উপজেলা বিএনপির উদ্যোগে বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল) বিকেলে চুনতি জাঙ্গালিয়া এলাকায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করার ঘোষণা দেন। লোহাগাড়া উপজেলা বিএনপি আহ্বায়ক নাজমুল মোস্তফা আমিন এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। বিএনপির পাশাপাশি বৃহস্পতিবার সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলায় পৃথক মানববন্ধন কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে জামায়াত। দলটির চট্টগ্রাম মহানগর আমির শাহজাহান চৌধুরী বুধবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তিনি দুর্ঘটনা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলবেন বলে স্থানীয়দের আশ্বস্ত করেছেন। লোহাগাড়া উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফরিদ উদ্দিন খান বলেন, এই এলাকায় আমার বাড়ি। ছোটবেলা থেকে আমি এখানে বড় হয়েছি। এখানে বারবার দুর্ঘটনার মূল কারণ এই সড়কটি সংকীর্ণ। প্রতিদিন হাজার হাজার গাড়ি চলে। তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পরবর্তী একনেক সভায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ক ৬ লেন করার বিষয়টি অনুমোদন দিতে হবে। তা না হলে আমরা এখানে মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও হরতাল দিতে বাধ্য হবো। দুর্ঘটনার স্থান পরিদর্শন শেষে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক ই আজম বীর প্রতীক বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে বারবার এখানে দুর্ঘটনা হচ্ছে, শুধু এখানে নয় এই সড়কের অন্য অংশেও এমন দুর্ঘটনা ঘটছে। চট্টগ্রাম থেকে আমাদের কক্সবাজার যেতে হলে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা সময় লাগছে। আর ঢাকার লোকেরা ফ্লাইটে করে আধা ঘণ্টায় কক্সবাজার পৌঁছচ্ছে, এটা একটা ডিসক্রিমিনেশনও বটে। এগুলোরও অবসান হওয়া উচিত। আর এখানে যে বেপরোয়া গাড়ি চলছে, এগুলোর স্থান চিহ্নিত করে বিভিন্ন জায়গায় যথাযথ প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করা দরকার। প্রসঙ্গত, ঈদের দিন (৩১ মার্চ) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে চুনতির জাঙ্গালিয়া এলাকায় বাসের সঙ্গে মিনিবাসের সংঘর্ষে ৫ জন নিহত হন। পরদিন দুটি মাইক্রোবাস সড়ক থেকে উল্টে পাশের খাদে পড়ে গেলে ১২ জন আহত হন। সবশেষ বুধবারের দুর্ঘটনায় ১০ জন নিহত হন। সবশেষ নিহত ১০ জনের পরিচয় মিলেছে লোহাগাড়ার চুনতি সবশেষ মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহত ১০ জনের পরিচয় পেয়েছে হাইওয়ে পুলিশ। নিহতরা হলেন— ঝিনাইদহের শৈলকুপা এলাকার দুলাল বিশ্বাসের ছেলে দিলীপ বিশ্বাস (৪৩), দিলীপ বিশ্বাসের স্ত্রী সাধনা মন্ডল (৩৭), দিলীপের শ্বশুর আশীষ মন্ডল (৫০), ঢাকার মিরপুরের আব্দুল জব্বারের ছেলে রফিকুল ইসলাম শামীম (৪৬), রফিকুল ইসলামের স্ত্রী লুৎফুন নাহার সুমি (৩৫), বড় মেয়ে আনিসা (১৬), ছোট মেয়ে লিয়ানা (০৮), মৃত রফিকুল ইসলামের ভাগিনা তানিফা ইয়াসমিন (১৬), মামা মুক্তার হোসেন (৬০) ও মাইক্রোবাস চালক ঢাকার দক্ষিণ খান এলাকার কালা মিয়ার ছেলে মো. ইউসুফ আলী (৫৫)। |