পৃথিবীর তাবৎ সাম্রাজ্যের মধ্যে আয়তনে বিশাল, অফুরন্ত সম্পদের অধিকারী এক মহান ইসলামি সাম্রাজ্য ছিলো আমাদের স্বাদের ভারত। ইসলামী সাম্রাজ্যের এই মহাভারত যখন সভ্যতার সুমহান আলোকবর্তিকা হয়ে দিগন্তে জ্বলছিল, তখন ইংরেজ বেণিয়াদের অশুভ লোভাতুর দৃষ্টি আমাদের সুমহান মহাভারতের উপর পড়ে। আর তখন থেকেই তারা ভারতবর্ষ দখলের সর্বোপরি প্রস্তুতি শুরু করেছিল। ছল বল কলাকৌশলের নির্মম প্রয়োগে বৃটিশরা এই সভ্য ভারতবর্ষে তাদের অসভ্যতার বিষদাত বসিয়ে দিতে সমর্ত হয়েছিল। একথা ঐতিহাসিক সত্য যে বিদেশি আর্য বা মুসলমান জাতির মতো সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনে আবদ্ধ হতে বৃটিশরা ভারতে আসেনি। তারা এসেছিলো ভারতের সম্পদ লুণ্ঠন করে নিজেদের দারিদ্রতা দূর করতে, এবং ইসলামি ভারতের উন্নত সভ্যতা শিখে নিজেদেরকে বর্বরতার অন্ধকার থেকে উত্তরণ করতে। ঐতিহাসিদের মতৈক্যে একথা স্পষ্ট যে, দুই শতাব্দী ধরে বৃটিশরা ভারত শোষণ করেছিলো তাদের ইউরোপীয় ঘৃণ্য কূটনীতিক চাল "ডিভাইড এ্যন্ড রুল" নীতি এর জোরে। এই নীতি ভারতের দুই প্রধান জনগোষ্ঠী, হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিকৃত ইতিহাসের প্রচারণার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দুঃখজনক হলেও সত্য, তাদের কলঙ্কিত নীতির সেই ছায়া একবিংশ শতাব্দীর এই আধুনি যুগেও ভারতের মাটিতে বিদ্যমান। আমরা দেখতে পাই ছেচল্লিশের ভয়াবহ দাঙ্গার মতো আজো ভারতের বুকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার নামে মুসলিম জনগোষ্ঠীর রক্তে হোলি উৎসব পালিত হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে এবং ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় একথা প্রতীয়মান, গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতার বড় বড় বুলি আওড়ানো ভারত সরকার নিজেই রাম নাম জপ করে মুসলিম নিধনে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। তারা মুসলিম জাতিকে নির্মূল ও সর্বস্বান্ত করার লক্ষ্যে চাণক্য নীতির 'শাম-দাম-দন্ড-ভেদ' কৌশল সর্বাত্মকভাবে প্রয়োগ করছে। দাঙ্গার আগুনে মুসলিম হত্যার পাশাপাশি তাদের সম্পদও ধ্বংস করা হচ্ছে। আবার কখনও দেখা যায় সরকারি বলয়ে অবৈধভাবে মুসলমানদের অর্থ- সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছে। কিন্তু মুসলিম সম্প্রদায়ের সম্পদের বিশাল একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে- যেমন মাদ্রাসা, মসজিদ, দরগা, এতিমখানা প্রভৃতি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান- দাঙ্গা বাঁধিয়ে ধ্বংস করা সম্ভব হচ্ছে না। এবং দেখা যাচ্ছে পৃথিবীর কোন আইনেই এগুলো বাজেয়াপ্ত করা কঠিন। তাই তারা এসব সম্পদ কুক্ষিগত করতে কৌশলের আশ্রয় নিয়ে 'ওয়াকফ বিল' প্রণয়ন করে। এখন এই 'ওয়াকফ এক্ট' এর মাধ্যমে মুসলিমদের এই অমূল্য সব সম্পদ অনায়াসে তাদের দখলে চলে যাবে। যে ভারতভূমিতে হাজার বছর ধরে মুসলমানরা সুশাসন করেছেন, ধন-দৌলত সভ্যতা সাংস্কৃতির উন্নতি ও বিকাশ ঘটিয়েছেন সেই ভূমিতে আজ মুসলিম জনগোষ্ঠী বৈষম্যের শিকার, সাম্প্রদায়িক হিংসার রক্তাক্ত ক্ষত নিয়ে দিন গুজরান করছে। অনেকে এই দায়ভার একচেটিয়াভাবে ব্রিটিশদের কাঁধে চাপিয়ে দিতে চান। কারণ ‘বিভেদ সৃষ্টি করে শাসন’—এই কলঙ্কিত নীতি তারাই সর্বপ্রথম সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু এই বক্তব্য যতটা সহজ শোনায় ইতিহাসের আলোকে ততটাই অপূর্ণ ও সত্যের অপলাপ। নীরদ সি. চৌধুরী, ড. গৌতম নিয়োগী, জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডে প্রমুখ— ঐতিহাসিকেরা প্রমাণ করেছেন, ঔপনিবেশিক শাসনের পূর্বেও ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কালো ছায়া বর্তমান ছিলো। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় বাদশাহ মুহাম্মদ শাহের শাসনকালে, ১৭২৯ সালে লাল কেল্লার সন্নিকটে একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছিল। ১৭২৯ এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে ১৮৯৭ পর্যন্ত অর্থাৎ ১৬৮ বছরে সর্বমোট ২২ থেকে ২৩টি ছোট-বড় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছিল। (তবে এখানে একটি গভীর চিন্তার বিষয় উঠে আসে: সে সময় মুসলিম শাসকদের হাতে ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও, এসব দাঙ্গায় মুসলিমরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন।) এই সত্য আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন তুলে ধরে—ব্রিটিশরা কি সত্যিই এই হিংসার মূল নায়ক? নাকি তারা ভারতীয় সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা হিংস্রতা ও রক্তপিপাসার বীজকে কেবল উন্মোচিত করেছিল মাত্র।ব্রিটিশরা যখন এই ভূখণ্ডে পা রাখে তখন তারা হাজার বছরের মুসলিম শাসনব্যবস্থার গোড়াপত্তন করেছিলো। তারা এখানেই ক্ষান্ত হয়নি বরং হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সেই বিষবৃক্ষে পানি ঢেলে সার দিয়ে যত্নে সহকারে গাছের শিকড়কে আরও গভীর ও মজবুত করে তুলেছিলো। এর ফল হিসেবে ১৯৪৬ সালে আমরা দেখতে পাই ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এই দাঙ্গা আজও ইতিহাসের পাতায় জীবন্ত হয়ে আছে। সরকারি হিসেবে শুধু কলকাতায় নিহতের সংখ্যা ছিল দশ হাজারের বেশি, আহত পনেরো হাজারেরও অধিক। এইচ ডি হডসন তাঁর ‘দ্য গ্রেট ডিভাইড’ গ্রন্থে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, এই ভয়াবহ দাঙ্গার পেছনে ব্রিটিশদেরই হাত ছিল। শৈলেশকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দাঙ্গার ইতিহাস’ গ্রন্থও এই সত্যের সাক্ষ্য বহন করে।
সমগ্র ভারত জুড়ে—গ্রামে, শহরে, কোণে-কোণে—দাঙ্গার আগুন জ্বলে উঠেছিল। হাজার হাজার মুসলিম নির্বিচারে হত্যার শিকার হয়েছিল। বিহারের তৎকালীন চিফ সেক্রেটারির বয়ান অনুযায়ী, শুধু পুলিশের গুলিতেই পাঁচ হাজারের বেশি মুসলিম প্রাণ হারিয়েছিলেন। প্রবাসী বুদ্ধিজীবী নীরদ সি. চৌধুরী নিজের চোখে দেখেছিলেন, ’৪৬-এর দাঙ্গায় হিন্দুরা কীভাবে উৎসবের আমেজে মুসলিমদের হত্যা করেছিল। তিনি তাঁর গ্রন্থে এই হৃদয়বিদারক চিত্র তুলে ধরেছেন। গুজরাট, যাকে ‘কসাই’ নামে ডাকা হয়, সেখানেও ’৪৬-এর দাঙ্গায় একদিনে দশ হাজার মুসলিমকে নির্মমভাবে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছিলো। ‘গুজরাটের গৈরিক সন্ত্রাসের ইতিকথা’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে, মুসলিম মোপলাদের নিহত সংখ্যা ছিল ৯,৩৫৬। ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’র হিসেবে, কাশ্মীরসহ আরও দুটি শহরে প্রতিদিন গড়ে ১০০-এর বেশি মুসলিম হত্যার শিকার হতো।
এই দাঙ্গার হিসেব যদি আমরা পুরোপুরি তুলতে যাই, তবে দুইশো পৃষ্ঠার গ্রন্থও তা সংকুলান হবে না। এই অমানবিকতার ধারাবাহিকতা আরো ভয়ংকর রূপ নিয়েছে যখন ২০১৪ সালে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসে। গেরুয়াদের সরকারি ছত্রছায়ায় বর্তমানে মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপর সাম্প্রদায়িক হামলা বেড়েছে দ্বিগুণ। গুজরাটে ২০০২ সালের গণহত্যার স্মৃতি যেন পুনরায় জীবন্ত করে তুলেছে ৪৬ এর ভয়াবহ দাঙ্গাকে। দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, আসামে দাঙ্গার আগুনে শত শত মুসলিম নিহত হয়েছে। ২০২০ সালে দিল্লির দাঙ্গায় সরকারি হিসেবে শুধু তিন দিনে পঞ্চাশের বেশি মুসলিম প্রাণ হারায়। এই হিংসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মসজিদ ও দরগা ধ্বংসের মহোৎসব। ২০১৯ সালে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের স্থানে রাম মন্দির নির্মাণের পর থেকে দেশজুড়ে শতাধিক মসজিদ ও দরগা ভেঙে ফেলা হয়েছে। উত্তরপ্রদেশে হজরতবাল মসজিদ, দিল্লিতে সুনেহরি মসজিদের মতো ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানও রেহাই পায়নি। এই ধ্বংসযজ্ঞে বিজেপি সরকার ধর্মীয় উন্মাদনাকে উসকে দিয়ে মুসলিমদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি মুছে ফেলতে উদ্যত হয়েছে।এই রক্তাক্ত ইতিহাস আমাদের সামনে একটি সত্য উন্মোচন করে—ব্রিটিশরা হয়তো হিংসার আগুনে ঘি ঢেলেছিল, কিন্তু সেই আগুনের বীজ ভারতীয় সমাজের গভীরে প্রোথিত ছিল। আজও সেই বিষবৃক্ষের ছায়া আমাদের তাড়া করে ফিরছে। এই অন্ধকার থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাতে হবে, সত্যকে গ্রহণ করতে হবে, এবং একে অপরের হাত ধরে আলোর পথে এগিয়ে যেতে হবে।
মাহফুজ বিন আব্দুল মালিক মোবারকপুরী: সিলেট, বাংলাদেশ।